আমার মা আমার ছয় মাসের গর্ভবতী স্ত্রীটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল...see more
আমার মা আমার ছয় মাসের গর্ভবতী স্ত্রীটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“যদি এভাবে বমি করে সবাইকে বিরক্ত করো, তাহলে উঠে গিয়ে বাথরুমেই খেয়ে আসো।”
সেদিন রাতের ডিনারের পুরো বিলটা আমি দিচ্ছিলাম।
বাড়ির প্রতিটা খরচ, প্রতিটা বিল, প্রতিটা দায়িত্ব—সব আমার কাঁধে।
আর ঠিক সেদিন রাতেই আমি ঠিক করলাম—এই অপমানের জবাব দেব… কিন্তু অন্যভাবে।
---
আমি কিছু বলিনি।
গলা তুলিনি, চেয়ার ছুঁড়ে মারিনি, কারো দিকে রাগ দেখাইনি।
শুধু একবার তাকালাম আমার স্ত্রীর দিকে—মেঘলা।
ওর চোখ ভরে গেছে পানিতে।
দুই হাত দিয়ে ও নিজের পেটটা ধরে আছে, যেন আমাদের অনাগত সন্তানকে আড়াল করে রাখতে চাইছে এই নিষ্ঠুর কথাগুলো থেকে।
আমরা বসেছিলাম শহরের এক নামী রেস্টুরেন্টে।
আমার ছোট বোন সাদিয়ার বিয়ের বার্ষিকী উপলক্ষে এই আয়োজন।
মা—বাহেরা—জোর করেই বলেছিল অনুষ্ঠানটা জমকালো হতে হবে।
আর আমাদের পরিবারে “জমকালো” মানেই একটাই—সব খরচ আমি দেব।
---
আমার বয়স ৩৪।
পেশায় বিনিয়োগকারী। আল্লাহর রহমতে এখন ভালোই উপার্জন করি।
কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছাতে আমার জীবনটা সহজ ছিল না।
১৬ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি।
তিনি রেখে গিয়েছিলেন ঋণ, অসুস্থতা, আর একটা ভেঙে পড়া পরিবার।
মা তখন একটা ছোট রেস্টুরেন্টে কাজ করত, অতিরিক্ত শিফট করত।
আমি পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শুরু করি।
নিজের স্বপ্ন থামিয়ে পরিবারটাকে বাঁচাতে নামতে হয়েছিল লড়াইয়ে।
ধীরে ধীরে সব ঠিক করেছি।
ঋণ শোধ করেছি, বাড়ি বাঁচিয়েছি, মাকে নিশ্চিন্ত জীবন দিয়েছি।
মাসে মাসে টাকা পাঠাই, চিকিৎসার খরচ দিই, গাড়ি কিনে দিয়েছি।
বোনের বিয়ে, বাসা, এমনকি সঞ্চয়ের ব্যবস্থাও করেছি আমি।
আমি কখনো হিসাব করিনি।
কারণ আমি ভাবতাম—এটাই আমার দায়িত্ব, এটাই ভালোবাসা।
কিন্তু সেদিন বুঝলাম—ওরা আমার ভালোবাসাকে দায়িত্ব না, বরং বাধ্যবাধকতা ভাবতে শিখে গেছে।
---
মেঘলা…
আমার স্ত্রী।
একটা কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা।
তার আয় খুব বেশি না, কিন্তু মনটা অসাধারণ।
নরম, ধৈর্যশীল, মায়াবী।
প্রথম দিন থেকেই মা আর সাদিয়া ওকে মেনে নিতে পারেনি।
সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু কথার আড়ালে খোঁচা মারত।
ওর পরিবার, ওর চাকরি, ওর পোশাক—সবকিছু নিয়ে।
আর মেঘলা সবসময় বলত,
“তুমি কিছু বলো না, আমি সহ্য করতে পারব।”
কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার পর সবকিছু বদলে গেল।
সমালোচনা বেড়ে গেল, উপদেশের নামে অপমান বাড়তে লাগল।
---
সেদিন দুপুরে মেঘলা নিজে হাতে একটা লেবুর কেক বানিয়েছিল—সাদিয়ার জন্য।
নতুন একটা নীল শাড়ি পরেছিল, শুধু যেন সবাই খুশি হয়।
শুরুতে সব ঠিকই ছিল।
আলাপ, হাসাহাসি—সব স্বাভাবিক।
কিন্তু ধীরে ধীরে কথার সুর বদলাতে লাগল।
মেঘলা সোডা-লেবুর পানি অর্ডার করেছিল।
মা সেটা নিয়ে ঠাট্টা করল।
সাদিয়া বলল, “এটা নাকি বাচ্চার জন্য ভালো না।”
মেঘলা বলল ডাক্তার অনুমতি দিয়েছেন।
তবুও ওরা থামেনি।
শেষমেশ মেঘলা চুপ করে গেল।
---
খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ ওর শরীর খারাপ হয়ে গেল।
বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা—স্বাভাবিক গর্ভকালীন সমস্যা।
ও বাথরুমে গিয়ে এল, কিন্তু ফিরে এসে আর খেতে পারছিল না।
আর তখনই মা সেই কথাটা বলল—
যেটা আমার ভিতরটা ভেঙে দিল।
---
সবাই চুপ।
সাদিয়া যোগ করল—
“যদি সামলাতে না পারো, তাহলে বাসায় থাকলেই পারতে।”
আর আমার স্ত্রী…
সে ক্ষমা চাইতে শুরু করল।
ক্ষমা চাইছে তার অসুস্থতার জন্য।
ক্ষমা চাইছে এই অবস্থার জন্য।
ক্ষমা চাইছে—মা হতে চলার জন্য।
---
আমি তখন উঠে দাঁড়ালাম।
চোখে রাগ ছিল না, গলায় উচ্চস্বরে কিছু ছিল না।
আমি মেঘলার হাত ধরলাম।
ওর বানানো কেকটা তুলে নিলাম।
তারপর শান্ত গলায় বললাম—
“তোমরা ভালো থেকো। আশা করি এই ডিনারটা তোমাদের মতোই নিখুঁত হয়েছে।”
---
আমরা বেরিয়ে এলাম।
কোনো ঝগড়া নয়, কোনো চিৎকার নয়।
কিন্তু গাড়ি চালাতে চালাতে আমি বুঝছিলাম—
আমার ভেতরে কিছু চিরতরে ভেঙে গেছে।
আর তারা এখনো জানে না—
আগামীকাল থেকে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
চলবে...?
---
নীরব_প্রতিশোধ

Comments
Post a Comment